পিইসি জেএসসি বনাম শিশুদের আত্মহত্যা

21

জানুয়ারি ২, ২০২০ রাত ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে ১৩ জন পিইসি, জেএসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। গত বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ মহা ধুমধামে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুক সয়লাব হয়ে যায় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সন্তান, নাতি-পুতিদের সাফল্য গাথায়। অনলাইন সংবাদ ব্রেকিং নিউজ দিতে থাকে ‘দেশজুড়ে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস’। এই উচ্ছ্বাস আনন্দকে ম্লান করে দেয় শিশুশিক্ষার্থীর এই সব আত্মহত্যা।

প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর ডজন ডজন ছেলেমেয়ের আত্মহননের খবর কি আমাদের একটুও উদ্বেলিত করে না? অভিভাবক-শিক্ষকদের দেওয়া চাপের কি কোনো ভূমিকা নেই শিশুদের ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বিষ খাওয়া বা গলায় দড়ি দেওয়ার পেছনে। পাস করেও শিশুরা আত্মহত্যা করছে সর্বোচ্চ গ্রেড না পাওয়ার জন্য।

শুধু পিইসি, জেএসসি নয়, ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষায় মা-বাবার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না হওয়ায় আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে শিশুরা। এবার এই তালিকায় যোগ হয়েছে ক্লাস থ্রি আর সিক্সের দুজন শিশু। এই দুজনকে ধরলে এখন পর্যন্ত আত্মহননের প্রকাশিত সংখ্যা ১৫ জন। যারা মারা যাচ্ছে, যাদের লাশ নিয়ে থানা-পুলিশ হচ্ছে, আমরা শুধু তাদের কথাই জানতে পারি। আত্মহত্যার চেষ্টা করার পর যারা প্রাণে বেঁচে যায়, তাদের সংখ্যা আমাদের জানার কোনো উপায় নেই।

গবেষকেরা বলছেন, প্রতি ২৫টি আত্মহত্যার চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত একজন মারা যায়। এই থেকে যাওয়া ২৪ জনকে নিয়ে কি আমাদের কিছুই করার নেই? আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য পৃথিবীব্যাপী কাজ করে সুইসাইড অ্যাওয়ারনেস ভয়েস অব এডুকেশন সংক্ষেপে এসএভিএ বা সেভ। এই সংস্থাটি জানাচ্ছে, এক শ জন নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবলে তাদের মধ্যে গড়ে ২৫ জন শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে। সেই হিসাবে আত্মহত্যার চেষ্টায় বেঁচে যাওয়া আর আত্মহত্যার কথা ভাবাদের সংখ্যা নিয়ে শঙ্কার কারণ আছে বৈকি।

কেন এমন হচ্ছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন কিশোর-কিশোরী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তদের মধ্যে অর্ধেকের সমস্যা শুরু হয় ১৪ বছর বয়সে। বাংলাদেশে ঠিক এই বয়সেই শিশুরা জেএসসির জন্য তৈরি হয়।

বছর কয়েক আগে করা বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে ১০ হাজার মানুষ এবং প্রতিদিন প্রায় ২৭ জন আত্মহত্যা করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোরী বলে জানা গেছে। ২ জানুয়ারির হিসাবেও কিশোরীরা এগিয়ে আছে।

এবারের মৃত প্রথম ১৩ জনের মধ্যে ১০ জনই মেয়ে শিক্ষার্থী। মেয়েদের ওপর চাপের অন্য একটা মাত্রা আছে। ছেলেদের বলা হয় পাস না করলে কাজে লাগিয়ে দেবে বা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবই। কিন্তু মেয়েদের সাফ বলে দেওয়া হয় যেমন জুটবে তেমন ঘরেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। আত্মঘাতী হওয়ার পেছনে অভিভাবকদের এ রকম লাগামহীন হঠকারিতা কম দায়ী নয়।

এবার জেএসসি পরীক্ষার আগে মফস্বলের এক স্কুলে গিয়ে পরীক্ষার্থী মেয়েদের কাছে হাসির ছলে জানতে চেয়েছিলাম, রেজাল্ট ভালো না হলে কার কার বিয়ে দিয়ে দেবে বলেছে মা-বাবা। ৫১ জনের মধ্যে ৩৫ জন ছিল মেয়ে, তাদের মধ্যে ১৯ জন হাত তুলে জানিয়েছিল, তাদের মা-বাবা জানিয়ে দিয়েছেন রেজাল্ট ভালো করতে না পারলে তাদের আর নাইন হবে না, বিয়ের লাইনে দাঁড়াতে হবে।

গত বছর যুক্তরাজ্যের ১০ হাজার কিশোর-কিশোরীর ওপর এক জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, সেখানে এক-তৃতীয়াংশ কিশোরী এবং প্রতি ১০ জন কিশোরের মধ্যে ১ জন ১৪ বছর বয়স থেকেই অবসাদে ভোগে। প্রায় সময়ই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতেও তাদের দেরি হয়ে যায়। এ কারণে প্রতিটি স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার প্রায় একই রকমের সুপারিশ করেছিলেন, তিনিও সব স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে একজন করে শিক্ষাবিষয়ক মনোবিদ নিয়োগের তাগিদ দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, সেটা হয়নি চট করে, সেটা হওয়ারও নয়।

শিশুদের আত্মহত্যা থেকে রক্ষার কোনো উপায় কি নেই? বড়দের সংযত আচরণ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার পারদটা চড়তে না দিলে শিশুরা বেঁচে যায়। সব অভিভাবক চাইছেন তাঁর কবজায় থাকা শিক্ষার্থীরা থাকুক সবার ওপরে। পত্রিকায় নিদেনপক্ষে ফেসবুকে মুখরক্ষার মতো রেজাল্ট হওয়া চাই। না হলে মুখ উজ্জ্বল করে বুক চিতিয়ে চলবে কীভাবে। এসব চাওয়ার বলি হচ্ছে তরতাজা শিশুরা। যেখানে মা-বাবা সন্তানের পরীক্ষার ফলাফলকে সামাজিক সম্মান রক্ষার হাতিয়ার বলে মনে করেন, সেখানে অসহায় শিশুদের বাঁচানোর রাস্তা খুবই চাপা, সংকীর্ণ। এই সংকীর্ণ পথের সমাধানের আলো দেখাতে পারেন শিক্ষকেরা। এই কাজের জন্য তাঁদের লম্বা-চওড়া ডিগ্রি নিয়ে মনোবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই।

১৬ বছরের ব্রিটিশ মেয়ে হাটি স্পার প্রথমবার আত্মহত্যায় ব্যর্থ হয়ে দ্বিতীয় চেষ্টা নিয়ে তখন মগ্ন। তাঁকে অনিবার্য আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন তাঁর স্কুলশিক্ষক। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন না হাটির সেই শিক্ষক, কিন্তু দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, এই মেয়েটি তাঁর নিজের মধ্যে নেই। তিনি শুরু করেছিলেন খুব সাদামাটাভাবে, জানতে চেয়েছিলেন কেমন আছে সে? সব ঠিক আছে তো? হাটির কিছুই ঠিক ছিল না, সে বছর ছিল হাটির জিসিএসই পরীক্ষা। এ প্রসঙ্গে হাটি পরে বলেছেন, ‘সেই প্রথম আমি কাউকে আমার কথাগুলো জানাই। তিনি আমার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। একপর্যায়ে আমি কাঁদতে থাকি। তিনি আমাকে থামাননি, আমার কথার মাঝখানে কোনো কথা বলেননি, প্রশ্ন করেননি, আমি যেন অনেকটা নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলছিলাম, যেটা আগে হয়নি। তিনি শুধু শুনে গেছেন। তাঁর এই নিস্তব্ধতা, উদারতা আমার ভেতরে সাহস জুগিয়েছে।’

সেই থেকে হাটি স্কুলের ভেতরে-বাইরে পুরো সময়টা তাঁর পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হাটি এখন ২৮, শিক্ষকতা করেন। জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য হাটি তাঁর সেই শিক্ষকের কাছে আজীবন ঋণী। ব্রিটেনের এই উদাহরণটি থেকে বোঝা যায় কাজটা খুব কঠিন নয়। আমরাও চেষ্টা করতে পারি। আরেকটি কথা, অন্য সব সভ্য দেশের মতো এসব পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল গোপনীয়তার মাধ্যমে যার যারটা শুধু তাকে তাকে জানতে দিলে ক্ষতি কি? বুলিং থেকে শিশুদের রক্ষা করার এ-ও এক রক্ষাকবচ হতে পারে।